Home অন্যান্যশিক্ষাস্মৃতির পাতায় বন্দী হচ্ছে পুরান ঢাকার চিরচেনা হালখাতা

স্মৃতির পাতায় বন্দী হচ্ছে পুরান ঢাকার চিরচেনা হালখাতা

by admin

পুরান ঢাকা | ছবি: স্টার নিউজ

‎পহেলা বৈশাখ এলেই একসময় পুরান ঢাকার অলিগলিতে দেখা যেত হালখাতার ধুমধাম আয়োজন।রঙ্গিন সাঁজে সাঁজানো হতো দোকানগুলো। ছিল ধূপ-ধুনা, ফুল ও আলপনার বহুরুপী সমাহার। নিয়ম তবিয়তে লাল খাতায় খোলা হতো নতুন হিসাব। যেখানে লেখা থাকত শুভ হালখাতা। পরমানন্দের সঙ্গে দেওয়া হতো ক্রেতাদের নিমন্ত্রণ।

বকেয়া পরিশোধ করলে উপহার হিসেবে থাকত শরবত, আতর ও ছোট ছোট উপহার। সাথে মিষ্টিমুখ আর আন্তরিক সম্পর্কের নবায়ন। সব মিলিয়ে এই হালখাতা ছিল পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে এক অনন্য ব্যবসায়িক ও সাংস্কৃতিক উৎসব। তবে সময়ের পরিবর্তনে সেই চিরচেনা হালখাতার রঙিন আমেজ এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।

‎সোমবার (১৩ এপ্রিল) পুরান ঢাকার শাখারী বাজার, ইসলামপুর, বাংলা বাজার, শ্যামবাজারসহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, কিছু ব্যবসায়ী এখনও ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করলেও আগের মতো উৎসবমুখরতা আর নেই। এখন হিসাব রাখা হয় মোবাইলের নোটপ্যাড কিংবা কম্পিউটারের এক্সেল শিটে। ডিজিটাল লেনদেন, মোবাইল ব্যাংকিং এবং আধুনিক হিসাব ব্যবস্থার কারণে হালখাতার প্রচলন কমে গেছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

‎শাঁখারী বাজারের হরিপ্রসন্ন মিত্র রোডের পাশে অবনী গোল্ড হাউজের স্বর্ণ ব্যবসায়ী অসীম ধর আক্ষেপ করে বলেন, ‘আগে বৈশাখ এলেই আমরা বড় করে হালখাতার আয়োজন করতাম। ক্রেতাদের দাওয়াত দিয়ে মিষ্টিমুখ করাতাম। এখন সেই পরিবেশ নেই। বেশিরভাগ লেনদেনই অনলাইনে হয়ে গেছে।’

‎একই এলাকার আরেক স্বর্ণ ব্যবসায়ী সঞ্জয় দে বলেন, ‘হালখাতা শুধু ব্যবসা নয়, সম্পর্কের বিষয় ছিল। এখন মানুষ সময় দিতে চায় না। তাই ছোট পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখতে হচ্ছে।আগে আমরা দেখতাম শাখারীবাজার ও চকবাজার এলাকায় সকাল থেকেই ঢাক-ঢোল, মাইকিং করে ডাকত। দোকানে ভিড় থাকত।দিনভর মিষ্টি বিতরণ হতো।সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো।তবে এখন কিছুই নেই।’

‎ইসলামপুর এলাকার রওশন ফেব্রিক্সের জয় সাহা জানান, ‘ইসলামপুরে আগে হালখাতার দিন দোকানে পা ফেলার জায়গা থাকত না। এখন সেই পরিবেশ নেই। এখন বাকি বেচাকেনা, বন্ধক রাখা-এসব কয়েক বছর ধরেই বিলুপ্তপ্রায়। তবে ‎কিছু পুরোনো কাস্টমার আসে, তবে আগের মতো উৎসব নেই।”

‎কুমারটুলি লেনের আরেক কাপড় ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন বলেন, “নতুন প্রজন্মের ব্যবসায়ীরা হালখাতার গুরুত্ব তেমন বোঝে না। তারা ডিজিটাল হিসাবেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।”

‎শাঁখারী বাজারের কাসা-পিতলের ব্যবসায়ী হরিদাস পাল বলেন, “আমরা এখনও হালখাতা করি, তবে খুব সীমিত আকারে। খরচ বেশি, কিন্তু লাভ আগের মতো হয় না।”

‎একই পেশার আরেক ব্যবসায়ী শ্যামল কর্মকার জানান, “আগে গ্রাহকেরা হালখাতার দাওয়াত পেলে খুশি হতেন। এখন অনেকে আসতেই চান না।”

‎পটুয়াখালি রোডের মহন চান গ্রাও সন্সের মিষ্টি ব্যবসায়ী মন্টু ঘোষ বলেন, “হালখাতা মানেই ছিল মিষ্টির বিক্রি বাড়া। এখন কিছু অর্ডার পাই, তবে আগের মতো চাহিদা নেই।”

‎শাহী ডিল্লি মিষ্টি দোকানের ব্যবসায়ী মনির হোসেন বলেন, “অনেক দোকানই এখন হালখাতা করে না। তাই আমাদের বিক্রিও কমে গেছে।”

‎শাঁখারিবাজারের হালখাতা ও টালি খাতা বিক্রেতা রিদয় নন্দী বলেন, “আগে বৈশাখের আগে হাজার হাজার খাতা বিক্রি হতো। এখন চাহিদা অনেক কমে গেছে।ডিজিটাল হিসাবের কারণে কাগজের খাতার ব্যবহার কমে গেছে। তাই ব্যবসাও কমে গেছে।”

‎চিঠি ও দাওয়াত কার্ড ছাপানোর ব্যবসায়ী মো. ‎শহীদুল ইসলাম বলেন, “হালখাতার নিমন্ত্রণপত্র ছাপানোর কাজ একসময় আমাদের প্রধান আয়ের উৎস ছিল। এখন অর্ডার খুবই কম।এখন অনেকেই ডিজিটাল কার্ড ব্যবহার করে।”

‎পুরান ঢাকার প্রবীণ ব্যবসায়ী মো. হাফিজ উদ্দিন বলেন, “হালখাতা আমাদের সংস্কৃতির অংশ ছিল। এখন তা হারিয়ে যাচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক। যুগের সঙ্গে পরিবর্তন আসবে, কিন্তু ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়। তার মতে, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চললেও হালখাতার মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজনকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সচেতনতা ও উদ্যোগ।

‎জনশ্রুতি অনুযায়ী, পুরান ঢাকার হালখাতা উৎসবের সূচনা ১৫৮৪ সালে সম্রাট আকবর বাংলা সন প্রবর্তনের মাধ্যমে। রাজস্ব ও হিসাব হালনাগাদের প্রথা থেকে। ১৭শ–১৮শ শতকে শাখারীবাজার, চকবাজার ও বাংলাবাজারে এটি সামাজিক উৎসবে রূপ নেয় এবং ব্রিটিশ আমলে আরও বর্ণাঢ্য হয়ে সার্বজনীনতা পায়। দেশভাগ ও পাকিস্তান আমলে কিছুটা ম্লান হলেও ১৯৭১ সালের পর আবার প্রাণ ফিরে পায়।

তবে বর্তমান বাস্তবতা হলো বাংলা নববর্ষের গুরুত্বপূর্ণ এই উৎসব কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল দেনদেন ব্যবস্থার যুগে মুখ থুবড়ে পড়েছে এই ঐতিহ্য।

Leave a Comment